মাসুদ রানা, মিশন পেঁয়াজ
প্রস্তাবটা লুফে নিল রানা। পকেটের ট্যাবটা বের করে গুগলে ‘পেঁয়াজ’ লিখে সার্চ দিল। রেজাল্ট এল Error: 404, page not found। ট্যাবের দিকে ঝুঁকে সেটা দেখে সোহেলের মুখ হাঁ হয়ে গেল, রানার মুখ আরও গম্ভীর। বাজারে পেঁয়াজ দুষ্প্রাপ্য, তাই বলে গুগলেও থাকবে না! দুজনেই আবার চিন্তার সমুদ্রে ডুবে গেল। ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙল শায়লা, নতুন জয়েন করেছে মেয়েটা, বেশ চটপটে। হাতে ধূমায়িত কফির মগ। কুশন সরিয়ে সোফায় বসতে বসতে বলল, ‘ফেসবুকিং করছ? আমার একটা উপকার করো না, প্লিজ! সকালে একটা প্রোফাইল পিকআপ করেছি, মোটে দুইটা কমেন্ট এসেছে। একজন লিখেছে “অ্যাড মি, আই অ্যাম বলক”, আরেকজন লিখেছে, “ফেসবুক থেকে টাকা আয় করুন, মাত্র পাঁচ মিনিটেই!” বোঝোই তো, প্রেস্টিজ পাংচার হওয়ার জোগাড়। রানা, প্লিজ, তুমি গিয়ে “ওয়াও কিউট” বলে একটা কমেন্ট করো না, প্লিজ...প্লিইইজ!’
‘আরে, রাখো তোমার প্রোফাইল পিক!’ ঝাঁজালো কণ্ঠে জবাব দেয় রানা, ‘গুগল থেকে পেঁয়াজ গায়েব হয়ে গেছে, সেই টেনশনে বাঁচি না; তুমি আছ প্রোফাইল পিক নিয়ে!’
‘ও মা, তাই নাকি! দেখি তো।’ ট্যাবটা প্রায় ছিনিয়ে নেয় শায়লা, ‘তোমরা দেখি আদ্যিকালেই পড়ে আছ! আরে বাবা, ইংরেজি ভার্সনে গিয়ে বাংলা লিখলে এমন তো হবেই! পেঁয়াজ লিখে সার্চ না দিয়ে অনিয়ন লিখে সার্চ দাও।’
রানা জবাব না দিয়ে ট্যাবটা ফিরিয়ে নিল। অনিয়ন লিখে সার্চ দিতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল বেশ কয়েকটা সাইট। অনিয়নের যাবতীয় বর্ণনা, উপকারিতা, পুষ্টিগুণ—কী নেই! হতাশ হয়ে পড়ল রানা, ট্যাব ছুড়ে ফেলল সোফার ওপর।
২.
রাত ১০টা। কারওয়ান বাজার। সন্দেহভাজন দুজন মাঝবয়সী অনেকক্ষণ ধরে ঘুরঘুর করছে পেঁয়াজের আড়তের আশপাশে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনে মিলে আলাপ-আলোচনা করতে শুরু করল আড়তদারের সঙ্গে। হাত নেড়েচেড়ে কথা বলছে ওরা। এর মধ্যে চারটা মশা হুল ফুটিয়েছে রানার ঘাড়ে আর বাহুতে। ডাস্টবিনের গন্ধে বমি এসে যাচ্ছে, উপায় নেই! অপেক্ষা করতে হবে।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। দুই বস্তা পেঁয়াজ কিনে ফেলল সন্দেহভাজনেরা। রানা আর গিলটি মিয়ার চোখে বিস্ময়। ঊর্ধ্বমূল্যের এই বাজারে সবাই যখন পেঁয়াজের দিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছে, তখন এই দুজন কিনা দুই বস্তা পেঁয়াজ কিনে ফেলল!
বাজার থেকে বের হয়ে দুই বস্তাওয়ালা এফডিসির সামনের সড়ক ধরে হাঁটতে লাগল। পিছু নিল রানা আর গিলটি মিয়া। বস্তাওয়ালা দুজন হাতিরঝিল পেরিয়ে একসময় মধুবাগের একটা ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ল। পেছন পেছন রানাও। বস্তাওয়ালারা লিফটের তিনে চাপল; রানা আর গিলটি মিয়া চলে গেল সিঁড়ির দিকে। অন্ধকার সিঁড়ি, পা টিপে টিপে উঠতে হচ্ছে।
চারতলায় উঠতেই রানার আক্কেলগুড়ুম! বস্তাওয়ালারা সামনে দাঁড়িয়ে! ঝট করে নিজেকে আড়াল করতে যাচ্ছিল রানা, ঠিক তখনই লাউড স্পিকারে গমগম করে উঠল কবীর চৌধুরীর কণ্ঠ, ‘এসো রানা, এসো। তোমার অপেক্ষায়ই ছিলাম। জানতাম, আমার লোকদের ফলো করে তুমি ঠিকই চলে আসবে। তোমার সাথে দারুণ একটা প্রজেক্ট আইডিয়া শেয়ার করব আজ।’
রানা বুঝল, পালানোর চেষ্টা করে লাভ নেই, ধরা পড়ে গেছে ও। সিঁড়ির নিচ দিক থেকে বেশ কয়েকজন মুশকোর পায়ের আওয়াজ ভেসে আসছে।
৩.
ওরা বসে আছে প্রায়-গুদামের মতো একটা ঘরে। একটা মাত্র জানালা। চিমসানো গরম। ঘরের এক কোনায় ষাট ওয়াটের বাল্বের নিবুনিবু আলো ঘরের পরিবেশ আরও নাটকীয় করে তুলেছে। সামনে পেঁয়াজের পাহাড়। কবীর চৌধুরী একনাগাড়ে কথা বলেই যাচ্ছে। রানা বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি বলতে চাও, এই প্রজেক্ট হাতে নিয়েছ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য?’
‘হ্যাঁ, রানা।’ কবীর চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত উত্তর।
‘কীভাবে?’
‘দেখো, রানা।’ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়েছে কবীর চৌধুরী, ‘এই হাজার হাজার টন পেঁয়াজ দিয়ে আমি ব্যবসা করব না। এগুলোর নির্যাস দিয়ে একটা নতুন কেমিক্যাল বানিয়েছি আমি। নাম দিয়েছি “ফিলিংস স্প্রে”। জানোই তো, পেঁয়াজের ঝাঁজে এমনিতেই কান্না পায়। এই ফিলিংস স্প্রে আমি বাংলাদেশের বাতাসে ছেড়ে দেব। শ্বাসের সাথে এই স্প্রে মানুষের চোখে জ্বালা ধরাবে। মানুষ কাঁদবে, ফিল করতে শিখবে।’
‘তুমি বলতে চাও, এত দিন মানুষের ফিলিংস ছিল না?’ পেঁয়াজের মতো ঝাঁজালো শোনায় রানার কণ্ঠ।
‘রানা, তুমি কি জানো, মানুষ কত সমস্যার জালে আটকা পড়ে আছে?’
‘বলে যাও, চৌধুরী।’
‘এত সমস্যা, কারও কিন্তু কোনো ফিলিংস নেই।’ পকেট থেকে স্প্রের বোতল বের করে চোখের সামনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে থাকে কবীর চৌধুরী, ‘আসলে আমরা অনুভূতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছি, রানা! কোনো কিছুই আর আমাদের বিচলিত করে না। আমি এই ফিলিংস স্প্রে দিয়ে মানুষের মরে যাওয়া অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে চাই! তুমি আমাকে থামাতে পারবে না।’
কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল চৌধুরী। এই সুযোগ, বিদ্যুৎগতিতে ডাইভ দিল রানা। ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল চৌধুরী। হাতের স্প্রে বোতলটাও, শূন্যেই সেটা লুফে নিল রানা। বস্তাওয়ালা দুজন এগিয়ে আসতেই ফিলিংস স্প্রে ছড়িয়ে দিল ওদের চোখে। দুজনেই থমকে দাঁড়াল মাঝপথে। জুড়ে দিল মায়াকান্না! কান্না শুনে মনে হতে লাগল, ওদের খুব আপন কেউ এইমাত্র মারা গেছে! ফিলিংস স্প্রের কার্যকারিতা দেখে রানাও আবেগতাড়িত হয়ে পড়ল। ওর মাঝেও যেন পুনরুজ্জীবিত হলো মরে যাওয়া ‘ফিলিংস’! মনোযোগ ছুটে গেল ওর। সুযোগ বুঝে নিজের ড্রোনটায় চেপে বসল কবীর চৌধুরী। রানা বাধা দেওয়ার আগেই সেটা চালু হয়ে গেছে। জানালা গলে কবীর চৌধুরীর ড্রোন ধীরে ধীরে একটা বিন্দুর মতো মিলিয়ে গেল হাজার নক্ষত্রের আকাশে।
৪.
পেঁয়াজ মিশন শেষে ওরা ফিরছে। পথে যেতে যেতে নীরবতা ভাঙল গিলটি মিয়া, ‘স্যার, আপনি যা-ই বলেন, বুদ্দিটা আমার ভীষণ মনে ধরেচে।’
‘কোন বুদ্ধি?’
‘দেকচেন না স্যার, আসলেই মানুষের কষ্টে আমাদের ফিলিংস আসে না। চধুরি কিন্তু এবার ভালো কাজেই হাত দিয়েচিল। শুধু পদ্ধতিটা দুই লম্বর। তাই না, স্যার?’
হেসে উঠল রানা, ‘সাধারণ মানুষের ফিলিংস ঠিকই আছে, গিলটি মিয়া!’ গাড়ির স্টিয়ারিংটা বাঁয়ে ঘুরিয়ে বলল, ‘শুধু “যথাযথ কর্তৃপক্ষেরই” কোনো ফিলিংসই নেই। চৌধুরীর তৈরি স্প্রের কয়েকটা নিয়ে এসেছি। এখন এগুলো জায়গামতো স্প্রে করব, ওদের ফিলিংস জেগে উঠলেই সাধারণ মানুষ বেঁচে যাবে, বেঁচে যাবে বাংলাদেশ!’
অন্ধকারে দাঁত বের করে নিঃশব্দে হেসে উঠল গিলটি মিয়া।
Post a Comment